একটি নিভে যাওয়া জীবনপ্রদীপ এবং আমাদের দায়
- আপলোড সময় : ০৭-০৬-২০২৬ ১২:৩৮:২৫ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৭-০৬-২০২৬ ১২:৩৮:২৫ পূর্বাহ্ন
টাঙ্গুয়ার হাওরের নির্মল জলরাশি, বিস্তীর্ণ নীলাভ প্রকৃতি আর অনিন্দ্য সৌন্দর্য প্রতি বছর হাজারো পর্যটককে টানে। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে কিছু অপ্রস্তুত বাস্তবতা, কিছু অবহেলা, কিছু অসচেতনতা। আর সেই বাস্তবতার নির্মম শিকার হলো মাত্র আট বছরের শিশু সৌম্যতা সরকার নিঝুম।
একটি পরিবারের আনন্দভ্রমণ মুহূর্তেই পরিণত হলো আজীবনের শোকে। যে শিশুটি একদিন পর আবার স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে চাইছিল, নাচের মঞ্চে নিজের প্রতিভা দেখানোর স্বপ্ন দেখছিল, সে আজ আর নেই। তার খালি বেঞ্চ, অসমাপ্ত খাতা, প্রিয় গান আর মিষ্টি হাসি শুধু স্মৃতির পাতায় রয়ে গেল।
একটি শিশুর মৃত্যু কখনোই শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়; এটি পুরো সমাজের বেদনা। নিঝুমের মৃত্যুর সংবাদে যে শোকের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে, তা প্রমাণ করে একটি কোমল প্রাণ কত মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারে। সহপাঠীরা তাকে খুঁজবে, শিক্ষকরা তার অনুপস্থিতি অনুভব করবেন, সাংস্কৃতিক অঙ্গন হারাবে একটি সম্ভাবনাময় প্রতিভাকে। কিন্তু সবচেয়ে বড় শূন্যতা থেকে যাবে তার বাবা-মায়ের জীবনে, যে শূন্যতা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়।
এই মর্মান্তিক ঘটনাকে আমরা কেবল ভাগ্যের নির্মম পরিহাস বলে পাশ কাটিয়ে যেতে পারি না। টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রায়ই দুর্ঘটনার খবর আসে। কখনো নৌকাডুবি, কখনো অসতর্কতায় প্রাণহানি, কখনো নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি। প্রশ্ন হলো- আর কত প্রাণ ঝরে গেলে আমরা নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব?
পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হাউসবোট ও নৌযান পরিচালনাকারীদের জন্য কঠোর নিরাপত্তা নীতিমালা নিশ্চিত করা জরুরি। শিশুদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সুরক্ষা বেষ্টনী, প্রশিক্ষিত কর্মী, পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট এবং নিয়মিত তদারকি ছাড়া পর্যটন কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত নয়। একই সঙ্গে ভ্রমণকারীদেরও সচেতন হতে হবে। আনন্দের মুহূর্তে সামান্য অসতর্কতা যে কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, নিঝুমের মৃত্যু তার নির্মম উদাহরণ।
আজ যখন একটি ছোট্ট মেয়ের অসময়ে চলে যাওয়ার সংবাদে পুরো সুনামগঞ্জ শোকাহত, তখন আমাদের উচিত এই শোককে দায়িত্ববোধে রূপান্তর করা। যেন আর কোনো বাবা-মাকে সন্তানের নিথর দেহ বুকে নিয়ে ফিরতে না হয়। যেন আর কোনো শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর প্রিয় ছাত্রীর স্মৃতিচারণ লিখতে বাধ্য না হন। যেন আর কোনো সহপাঠী হঠাৎ করে তার বন্ধুর খালি আসনের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে না হয়।
সৌম্যতা সরকার নিঝুম আর ফিরবে না। কিন্তু তার চলে যাওয়া আমাদের একটি কঠিন শিক্ষা দিয়ে গেল- জীবন অমূল্য, আর নিরাপত্তার কোনো বিকল্প নেই।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়